Untitled-1

কম সুদে গ্রামীণ কৃষিতে ঋণ দিয়ে কৃষক ও কৃষি খাতের উন্নয়নের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত শতভাগ সরকারি মালিকানাধীন বিশেষায়িত ব্যাংক- বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) নিজের জন্ম ইতিহাস ভুলে গেছে। ঋণ থেকে কৃষকদের দূরে ঠেলে দিয়ে কৃষকের নামে সরকারের কাছ থেকে নেওয়া ভর্ভুকির সুদের ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে আমদানি অর্থায়ন ও অকৃষি বাণিজ্যিক খাতে। এতে ভূমিহীন কৃষক, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক এবং বর্গাচাষিরা ঋণের অভাবে চাষাবাদে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছে। আর বৈদেশিক ঋণ, অকৃষি বাণিজ্যিক ঋণে মগ্ন হয়ে খেলাপি ঋণের সঙ্গে মূলধন ঘাটতির ভারে ফাটল ধরেছে ব্যাংকটির ভিত্তিতেও।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে বিকেবি মোট যে ঋণ বিতরণ করেছে, তার মধ্যে ‘হতদরিদ্র কৃষক’ পেয়েছে মাত্র দশমিক ৯১ শতাংশ। অর্থাৎ, বিকেবি ১০০ টাকা ঋণ বিতরণ করে থাকলে তার মাত্র ৯১ পয়সা পেয়েছে তারা।
বাংলাদেশে ‘হতদরিদ্র কৃষক’-এর কোনো সংজ্ঞা নেই উল্লেখ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাই বর্গাচাষি (যেসব কৃষক অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করে এবং নিজস্ব মালিকানায় জমির পরিমাণ সর্বোচ্চ এক একর), ভূমিহীন কৃষক (যাদের জমির পরিমাণ দশমিক ৪৯৪ একরের কম) ও প্রান্তিক কৃষক (যাদের জমির পরিমাণ দশমিক ৪৯৪ একর থেকে ২.৪৭ একর)- এই তিন শ্রেণির কৃষককে সমষ্টিগতভাবে হতদরিদ্র কৃষক বলে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত এই তিন শ্রেণির কৃষকই সরাসরি কৃষিকাজ বা ফসল উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। দেশের বেশির ভাগ কৃষকের জমির পরিমাণ ২.৪৭ একরের কম। এর চেয়েও বেশি জমি যাদের রয়েছে, তারা সাধারণত সরাসরি কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। সে হিসেবে সরাসরি কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত কৃষকরা কৃষি ব্যাংকের মোট ঋণের মাত্র দশমিক ৯১ শতাংশ ভোগ করছে। কৃষকদের ছেড়ে ব্যবসায়ীদের কাছে যাওয়ার বিষয়টিকে হতাশাজনক উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, কৃষকদের ঋণ না দিয়ে বিকেবি প্রতিষ্ঠাকালীন কর্মপরিধি বহির্ভূত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে বৈদেশিক বাণিজ্য ও অকৃষি বাণিজ্যিক খাতে বিপুল পরিমাণ ঋণ বিতরণ করছে, যা ব্যাংকটিকে মারাত্মক ঝুঁকিতেও ফেলেছে। কারণ, এসব ঋণের বেশির ভাগই খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। ফলে ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতিও বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিকেবি ৩৪ লাখ ৯ হাজার ৩৬৩ জনকে ১৫ হাজার ১২৩ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। এর মধ্যে ভূমিহীন ৬১২ জন চাষি ঋণ পেয়েছে এক কোটি ৪৩ লাখ টাকা। এক লাখ ১৯ হাজার ৩৭৮ জন প্রান্তিক চাষিকে দেওয়া হয়েছে ১০৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা এবং দুই লাখ ৪৩ হাজার ২৩৬ জন বর্গাচাষিকে দেওয়া হয়েছে ৩০ কোটি টাকা। অর্থাৎ সব মিলিয়ে তিন লাখ ৬৩ হাজার ২২৬ জন হতদরিদ্র কৃষককে মোট ১৩৭ কোটি ৭০ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। এটি বিকেবির বিতরণ করা মোট ঋণের দশমিক ৯১ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, মূলত দরিদ্র কৃষক ও প্রান্তিক চাষিদের কম সুদে ঋণ দেওয়ার জন্যই সরকার এ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছে। তারা কোনো অবস্থাতেই কৃষকদের ঋণ না দিয়ে অন্য খাতে ঋণ দিতে পারে না। কৃষকরা যাতে কম সুদে সময়মতো ঋণ নিতে পারে, সে জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনরর্থায়ন তহবিল থেকে বিকেবিকে টাকা দেওয়া হয়। বিকেবি সেই টাকার সুদ ফেরত দেওয়া দূরের কথা, অনেক সময় আসল অর্থও পরিশোধ করে না। কৃষকদের স্বার্থে বিকেবির পক্ষে সরকার সে অর্থ পরিশোধ করে ভর্তুকি হিসেবে। সরকারের এই ভর্তুকির টাকা কৃষকদের না দিয়ে বিকেবি যেভাবে বাণিজ্যিক খাতে ঋণ দিচ্ছে, তা কোনোমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই টাকা কৃষকদের মাঝে ঋণ দেওয়া হলে কৃষকের পাশাপাশি কৃষি খাতেরও উন্নতি হতো। আর কৃষকরা ১০-১৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে নেহাত বিপদে না পড়লে খেলাপি হয় না। কিন্তু কৃষি ব্যাংক কৃষকদের ঋণ না দিয়ে যাদের দিচ্ছে, তারা সেই অর্থ আর ফেরত দিচ্ছে না। বৈদেশিক বাণিজ্য ঋণ দিতে গিয়ে এলসি বা ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রেও জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে ব্যাংকটিতে। এ অবস্থায় কৃষি ব্যাংকের ওপর সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নজরদারি রাখা প্রয়োজন। তা হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত কৃষি ব্যাংককে পুনরর্থায়ন তহবিল থেকে অর্থের জোগান দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া।
ড. সালেহউদ্দিন বলেন, ‘আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়ই দেখেছি, কৃষির নামে বিকেবি অন্যান্য খাতে ঋণ দিচ্ছে। বিভিন্ন প্রকল্পে বা আমদানি অর্থায়নে বড় অঙ্কের ঋণ দিতে গিয়ে অনিয়মও হয়েছে, বেশ কিছু অনিয়ম ধরাও পড়েছে। বড় অঙ্কের ঋণগুলো খেলাপি হয়ে যাচ্ছিল। তখনো বিকেবিকে সতর্ক করা হয়েছিল। এখন সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে শক্ত অবস্থান নিতে হবে।’
প্রকৃত কৃষকদের মাঝে এই বিন্দুতম ঋণ বিতরণের তথ্যে হতাশ বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের পর্যবেক্ষণে বলেছে, ব্যাংকটির মোট ঋণ কার্যক্রমের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হতদরিদ্র কৃষকদের মাঝে বিতরণের বাধ্যবাধকতা থাকা আবশ্যক। একই সঙ্গে বৈদেশিক বাণিজ্য-সংক্রান্ত ও অকৃষি খাতে ঋণ বিতরণে ব্যাংকটিকে নিরুৎসাহিত করা যুক্তিযুক্ত হবে। কারণ, বিকেবি প্রতিষ্ঠাকালের চার্টারে উল্লিখিত কর্মপরিধি বহির্ভূত কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে তাদের সময় ও সম্পদ চার্টারভুক্ত মূল (কৃষক ও কৃষি খাতে ঋণ দেওয়া) কাজে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে ব্যবহার করতে ব্যর্থ হচ্ছে। হতদরিদ্র কৃষকদের মাঝে ঋণ বিতরণ কম হওয়া এবং ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের আধিক্য তথা, ক্রমাগত লোকসান ও মূলধন ঘাটতির কারণ হিসেবে বৈদেশিক বাণিজ্য ঋণ এবং প্রকল্প বা বাণিজ্যিক ঋণ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ অনেকাংশে দায়ী। তাই বিকেবির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক অর্ডার, ১৯৭৩-এ বিধৃত কার্যক্রম এর মধ্যে সীমিত রাখা এবং তাদের ঋণ কার্যক্রমের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হতদরিদ্র কৃষকদের মাঝে বিতরণের বিষয়ে বাধ্যবাধকতা থাকা আবশ্যক। বিকেবির বৈদেশিক বাণিজ্য ঋণ কার্যক্রম কেবল কৃষি-সংশ্লিষ্ট শিল্প সেবা বা পণ্যের মধ্যে সীমিত রাখা এবং সেসব ঋণ কার্যক্রমে অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন আবশ্যক।
কৃষকের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ব্যাংকটি যে ধ্বংসের পথে হাঁটছে, তা স্পষ্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, বিকেবির খেলাপি ঋণের বেশির ভাগই বৈদেশিক বাণিজ্য ও অকৃষি খাতে দেওয়া বাণিজ্যিক ঋণ। কৃষি অর্থনীতিতে, বিশেষ করে গ্রামীণ কৃষিতে অর্থায়নের জন্য প্রতিষ্ঠিত এ ব্যাংকটি বাড়তি ব্যবসায়ের আশায় তাদের মূল কাজ কৃষি ঋণ কার্যক্রম কমিয়ে বৈদেশিক বাণিজ্য ঋণ ও অকৃষি বাণিজ্যিক ঋণ কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করায় খেলাপি ঋণ ব্যাপকভাবে বাড়ছে। গত বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ছয় হাজার ৪০৬ কোটি টাকা। এ সব খাতে ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে ব্যাংকটি বিপুল অঙ্কের মূলধন ঘাটতিতে পড়ে। গত বছরের ৩০ জুন এর মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ছিল ছয় হাজার ৭২৬ কোটি টাকা।
বিকেবির ১৬টি অনুমোদিত বৈদেশিক বাণিজ্য লেনদেন (এডি) শাখার তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এডি শাখাগুলোর ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ তিন হাজার ৬১৩ কোটি টাকা, যা গোটা ব্যাংকের ঋণ ও অগ্রিমের ২৪ শতাংশ। এডি শাখার এই ঋণের মধ্যে অকৃষি বাণিজ্যিক ঋণ ১৯২৬ কোটি টাকা, যা তাদের মোট ঋণের ৫৩ শতাংশ। একই সময়ে এডি শাখাগুলোর বৈদেশিক বাণিজ্য ঋণ ছিল ১৬০০ কোটি টাকা, যা শাখাগুলোর মোট ঋণের ৪৪ শতাংশ। অর্থাৎ, বিকেবি তার মোট ঋণের ২৪ শতাংশ বিতরণ করছে ১৬টি এডি শাখার মাধমে, বাকি তিন-চতুর্থাংশ ব্যাংকের অবশিষ্ট ৯৯৯টি শাখার মাধ্যমে বিতরণ করা হচ্ছে। অথচ এডি শাখাগুলোর ঋণের বড় অংশ একক ঋণ গ্রহীতার অনুকূলে দেওয়া বড় অঙ্কের আমদানি অর্থায়ন, যা আদায় না হওয়ার কারণে নন-ফান্ডেড থেকে ফান্ডেড ঋণে রূপান্তরিত খেলাপি ঋণ।
বিকেবির ১০১৫টি শাখার ঋণ তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, একজন ঋণ গ্রহীতাকে এক কোটি টাকা বা তার বেশি অর্থ ঋণ দেওয়া হয়েছে, এমন শাখার সংখ্যা ৮০টি। গত বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত এই শাখাগুলোর ঋণ ও অগ্রিমের স্থিতি চার হাজার ৬৩১ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট ঋণ ও অগ্রিমের ৩২ শতাংশ। এই শাখাগুলো গ্রামের বদলে বাণিজ্যিক শহরগুলোর কেন্দ্রে অবস্থিত। এই ৮০টি শাখায় খেলাপি ঋণ ১৪৭২ কোটি টাকা, যা গোটা ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ ৪৭৬৭ কোটি টাকার ৩১ শতাংশ।
কৃষি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ড. ইব্রাহিম খালেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কৃষি ব্যাংক কৃষকদের ঋণ না দিয়ে বাণিজ্যিক খাত ও বৈদেশিক বাণিজ্যে ঋণ বিতরণ করবে, এটা কোনোমতেই কাম্য নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে হতদরিদ্র কৃষকদের মাঝে ঋণ বিতরণের হার দশমিক ৯১ শতাংশ বলা হলে তা আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। এটি কোনোমতেই ৬০ শতাংশের কম হওয়া উচিত নয়।’