12

প্রকাশ : ০৪ জুলাই, ২০১৫ ০০:০০:০০
kalaer khonto

মৌসুমের শুরুতেই সরকারি ক্রয়ে চালের দাম ঘোষণা করা হয়েছিল, বাড়ানো হয়েছিল কেজিতে দুই টাকা। এরপর আমদানিতে ১০ শতাংশ কর বসিয়ে বাজারে চালের দাম ধরে রাখার চেষ্টাও করে সরকার। কিন্তু এত সব আয়োজনের পরও চলতি মৌসুমে বোরো ধানের উৎপাদন খরচ ওঠাতে পারছে না কৃষক। একদিকে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, অন্যদিকে চাল আমদানি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থতা- এই দুয়ে মিলে ধান এবারও গলার ফাঁস হয়েই গোলায় উঠল কৃষকের।
সরকারি হিসাবে প্রতি কেজি ধান উৎপাদনে এবার খরচ হয়েছে ২০ টাকা। সে হিসাবে এক মণ (৩৭.৫ কেজি) ধানের উৎপাদন খরচ দাঁড়ায় ৭৫০ টাকা। বাজারে এখন মোটা ধান বিকোচ্ছে ৫২০ টাকা থেকে ৫৫০ টাকা। চিকন ধান বিকোচ্ছে ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা মণ দরে।
মৌসুমের শুরুতে যে দর ছিল তার চেয়ে মাঝামাঝিতে বেশি ছিল। কারণ তখন মিলগুলো সরকারি ক্রয়ের চাল সরবরাহ করার জন্য কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনা শুরু করেছিল।
এখন আবার বাজারে ধানের চাহিদা কম। ফলে ধানের দাম আবার কমে গেছে; যদিও মাঝখানে যতটুকু বেড়েছিল তাতেও কৃষকের মুনাফা হয়নি। কারণ বাড়তি দরও উৎপাদন খরচের চেয়ে কম ছিল।
সরকার কৃষকদের ভালো দাম দিতে প্রতিবছরই সরকারি ক্রয়ে চালের দাম বাড়িয়ে ধরছে। পাশাপাশি মৌসুম শুরুর অনেক আগেই দাম ঘোষণা করা হচ্ছে, যাতে বাজারের ওপর প্রভাব পড়ে। এর প্রভাবও আছে। এসব উদ্যোগ না নিলে ধানের দাম আরো কমে যেত বলে দাবি করেছেন বাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কিন্তু বাড়তি উৎপাদন হওয়া ও বাজারে চাহিদা কম থাকায় ধানের দাম তেমনভাবে বাড়ছে না বলে মনে করেন তাঁরা।
মিল মালিকরা ধানের দাম কমে যাওয়ার জন্য আমদানিকে দায়ী করে আরো শুল্ক আরোপের দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে আমদানিকারকরা বলছেন, মিল মালিকরা কম দামে ধান কিনে চালে বেশি মুনাফা করেন। তাঁদের কারণেই ভারত থেকে চাল আমদানির সুযোগ তৈরি হয়।
নওগাঁয় চলতি মৌসুমের শুরুর দিকে মোটা ধানের দাম ছিল ৪৭০ থেকে ৫২০ টাকা। জিরাশাইল (এ ধান থেকেই মিনিকেট চাল হয়) দাম ছিল প্রতি মণ ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা। সরকারি ক্রয়ে সরবরাহ করার জন্য মিল মালিকরা যখন ধান কিনতে শুরু করেন তখন মোটা ধানের দাম বেড়ে ৫৭০ থেকে ৬২০ টাকা হয়। জিরাশাইল হয় ৬৭০ থেকে ৭২০ টাকা। কিন্তু মিলগুলো এখন আর তেমন ধান কিনছে না। ফলে মোটা ধান আবার এখন ৫২০ থেকে ৫৫০, চিকন ধান ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকায় নেমেছে।
মৌসুমের শেষ দিকে এসে ধানের দাম কমে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে চালকল মালিক সমিতির কার্যনির্বাহী সদস্য শহিদুর রহমান পাটোয়ারী বলেন, গত বছর মৌসুমের শুরুতে চালের দাম যা ছিল, শেষেও তা-ই ছিল। ফলে ধান কিনে রেখে তাতে লোকসান দেননি এমন কোনো মিল মালিক নেই। কারো কম লোকসান হয়েছে, কারো বেশি। তাই এবার ধান কিনে রাখার ঝুঁকি কোনো মিল মালিক নিচ্ছেন না।
এক কেজি চালের পেছনে তিন মাসে তিন টাকার মতো সুদ ব্যয় হয় বলে জানিয়ে তিনি বলেন, ৩০ টাকার চাল তিন মাস পর ৩০ টাকা থাকলে কোনো লাভ হয় না, উল্টো তিন টাকা সুদের খরচ হয়। কয়েক মাস পরে সরকার চালের শুল্ক তুলে নেবে কি না, ২৪ টাকা কেজি দরে সরকারি চাল বিক্রি শুরু হবে কি না- এসব অনিশ্চয়তা রয়েছে। এ কারণে মিল মালিকরা ধান কিনে মজুদ করতে নারাজ।
গত ৩ মার্চ খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির বৈঠকে ১০ লাখ টন চাল কেনার সিদ্ধান্ত হয়। আগের বছরের চেয়ে কেজিতে দুই টাকা বাড়িয়ে দাম ধরা হয় কেজিপ্রতি ৩২ টাকা। মিল পর্যায়ে প্রতি কেজি মোটা চাল এখন ২৫-২৬ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ফলে সরকারি ক্রয়ের তুলনায় বাজারে দর এখন কেজিপ্রতি সাত-আট টাকা কম। বোরোতে প্রায় এক কোটি ৯০ টন চাল উৎপাদিত হবে। সরকারি ক্রয় মোট চালের ৫ শতাংশের কাছাকাছি।
সরকারি চালের পুরোটাই মিল মালিকদের কাছ থেকে কেনা হয়। উৎপাদন খরচের তুলনায় কেজিতে পাঁচ টাকা বাড়তি দিয়ে চাল কেনা শুরু হয়েছে। তবে মিল মালিকদের লাভ আরো বেশি হচ্ছে। কারণ তাঁরা উৎপাদন খরচের তুলনায় ধান আরো কম দামে কেনার সুযোগ পেয়েছেন। পাশাপাশি তাঁরা কুঁড়া বিক্রির সুযোগও পাচ্ছেন।
গত বছর এ সময়ে বাজারে চালের যে দাম ছিল তার চেয়ে এখন তা অনেক কম। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় এখন প্রতি কেজি মোটা চালের দর ২৮ থেকে ৩০ টাকা, যা গত বছরের চেয়ে ১৩.৪৩ শতাংশ কম। অন্যদিকে চিকন চালের দাম গত বছরের তুলনায় ১৬.৩০ শতাংশ কমেছে। তাদের হিসাবে, এক বছর আগের তুলনায় ঢাকায় মোটা ও চিকন চালের দাম ৬ শতাংশ কমেছে।
শহিদুর রহমান পাটোয়ারী বলেন, গত দু-তিন বছর কৃষকরা ধানের দাম পেয়েছে। এ বছর ভালো দাম পাচ্ছে না। গত বছর মিল পর্যায়ে যে চাল ৩০ টাকার ওপরে ছিল এখন তা ২৫-২৬ টাকায় নেমেছে। তবে সরকার শুল্ক আরোপ ও আগাম দাম ঘোষণা না করলে বাজার আরো পড়ে যেত।
এদিকে শুল্ক আরোপের কারণে আগের চেয়ে কমলেও চাল আমদানি হচ্ছে। বেনাপোল বন্দরভিত্তিক একাধিক চাল আমদানিকারক জানিয়েছেন, ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ফলে চাল আমদানিতে কেজিপ্রতি তিন টাকার মতো বাড়তি খরচ লাগছে। কিন্তু ভারতে দাম কমে যাওয়ায় তাঁদের লাভ থাকছে।
চাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মুকুল এন্টারপ্রাইজের মালিক মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, আগে যে চাল ২৩-২৪ টাকা কেজি দরে আমদানি করা যেত, সেটি এখন ২৬-২৭ টাকা পড়ছে। কিন্তু একই মানের দেশীয় চাল বাজারে ৩০ টাকা। চিকন চাল আমদানিতে এখন কেজিপ্রতি ৩২ থেকে ৩৪ টাকা খরচ পড়ছে জানিয়ে তিনি বলেন, একই চাল দেশে ৪০ টাকার বেশি।
চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কে এম লায়েক আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, শুল্ক আরোপের পর ভারতের রপ্তানিকারকরা চালের দাম কমিয়ে দিয়েছেন। অন্তত ৩০ শতাংশ শুল্ক আরোপ না করলে চাল আমদানি বন্ধ হবে না।
ভারতে চালের দাম কমার কথা স্বীকার করে আমদানিকারক মিজানুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের মিল মালিকরা কম দরে ধান কিনে বেশি দরে চাল বিক্রি করতে চান। তাঁদের অতিমুনাফা করার প্রবণতার কারণে ভারত থেকে চাল আমদানি হয়। নইলে দেশে চালের কোনো প্রয়োজন নেই।