সোমবার, ১৩ অক্টোবর ২০১৪ ১১:১৭ ঘণ্টা

রাজধানীতে বাস্তুহারা ৪০ লাখ মানুষ

শাহেদ শফিক, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বাংলামেইল২৪ডটকম

ঢাকা: ১৯৮৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪০তম অধিবেশনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে প্রতি বছরের অক্টোবর মাসের প্রথম সোমবারকে ‘বিশ্ব বসতি দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। তবে প্রথম সোমবার ঈদুল আজহা থাকায় বাংলাদেশে দ্বিতীয় সোমবারকে ‘বিশ্ব বসতি দিবস’ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। এ উপলক্ষে সরকার ও বিভিন্ন সংগঠন নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। সরকারের পক্ষ থেকেও নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। কিন্তু বাসস্থান হারাদের বসতির ব্যবস্থায় নেই কোনো কার্যকর উদ্যোগ। বিশ্বজুড়ে মানুষের বসতির জন্য নানা উদ্যোগ আর আলোচনা থাকলেও এখনো রাজধানী ঢাকায় ৪০ লাখেরও বেশি মানুষ আশ্রয়ের খোঁজে ঘুরছেন। গত ৫ মার্চ জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম জানিয়েছেন, বর্তমানে ঢাকা শহরে বস্তির সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার ৭২০টি। আর বস্তিবাসীর সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। এটি সরকারি হিসাব হলেও বেসরকারি হিসেবে এর সংখ্যা দেড়গুণ। নদী ভাঙনসহ বিভিন্ন কারণে সর্বস্ব হারিয়ে তারা এখন নিঃস্ব। খোলা আকাশ আর ঝুপড়ি বস্তিতেই তাদের বসবাস। সরকারের পক্ষ থেকেও এদের জন্য কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। সর্বস্ব হারিয়ে অসহায় এসব মানুষ যখন শেষ আশ্রয় ও অন্ন জোটানোর জন্য রাজধানী ঢাকা এসে ফুটপাত অথবা কোনো বস্তিতে আশ্রয় নেয় তখনো তাদের ওপর চলে নানা নিষ্ঠুরতা। মাঝে মধ্যে উচ্ছেদ অভিযান করে ভেঙে দেয়া হয় তাদের সব কিছু। কিন্তু একবারও ভাবা হয় না তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই।Bosti-3২০১২ সালে পরিচালিত বিশ্বব্যাংকের এক জরিপে দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকায় প্রতি বছর ৩ থেকে ৪ লাখ নতুন মানুষ যোগ হচ্ছে। এদের অধিকাংশই হতদরিদ্র। যারা রিকশা ও ভ্যান চালিয়ে বা দিন মজুরি করে অর্থ উপার্জনের আশায় ঢাকায় আসে। বাসা বাড়ি বা উন্নত স্থাপনায় থাকার সাধ্য না থাকায় অধিকাংশই এসে উঠছেন নগরীর বিভিন্ন বস্তিতে। পরবর্তীতে বস্তি থেকে উচ্ছেদ হয়ে ফুটপাথের বাসিন্দাদের সংখ্যা বৃদ্ধিতেও বড় ভূমিকা রাখছেন এরাই। রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ও অলি-গলিতে চোখ মেললেই দেখা যায় পলিথিনের ঝুপড়ি। এগুলো মূলত শহরের আশ্রয়হীন মানুষের ডেরা। যাদের এই ‘সম্পদটি’ ছাড়া আর কিছুই নেই। এক সময় রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশন, সেখানকার প্লাটফর্ম কিংবা মহাখালী, সায়েদাবাদ ও কল্যাণপুরের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এসব মানুষকে বেশি দেখা যেতো। কিন্তু বর্তমানে হাইকোর্ট, গুলিস্তান, বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিল, শিল্পাঞ্চল তেজগাঁও, অভিযান এলাকা গুলশান, বনানী, ধানমণ্ডি, মিরপুর, শ্যামলী, মোহাম্মদপুরসহ নগরীর সর্বত্রই এদের অবস্থান চোখে পড়ে। সরকারের বস্তি পুনর্বাসন প্রকল্পের বেহাল অবস্থা এবং রাজধানীর বস্তিগুলোতে অপরিকল্পিত উচ্ছেদ অভিযান চালানোর ফলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন নগর বিশেষজ্ঞরা।Bosti-2২০১২ সালের ৪ এপ্রিলে কড়াইল বস্তিতে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। কিন্তু তাদের পুনর্বাসনের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। একই বছরের ৭ অক্টোবর মহাখালীর সাততলা বস্তিতে ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ডে ঘর হারিয়েছেন ১ হাজার ৫০ জন। এর আগে ঘটে যাওয়া বেগুনবাড়ী বস্তির অগ্নিকাণ্ডেও ৫শ’ মানুষ গৃহহীন হয়েছেন। এ দুটি বস্তির ঘরহারাদের পুনর্বাসনের জন্যও নেয়া হয়নি কোন ব্যবস্থা। এসব ঘটনার ফলেই ঘটেছে বাস্তুহারা ও আশ্রয়হীন জনগোষ্ঠীর ব্যাপক বিস্তার। তবে সম্প্রতি সরকার বাস্তুহারাদের পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা দিতে না পারলেও কিছুটা সহনশীল হয়েছে। মানবিকতা বিবেচনায় যখন তখন উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয় না। গত মাসে রাজধানীর রেললাইনগুলোতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হলেও বস্তি উচ্ছেদ করা হয়নি। সূত্র জানায়, ১৯৯৬ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে শুধু ঢাকা, চট্টগ্রাম ও দিনাজপুরের ১১৫ বস্তি থেকে ২ লাখ ৯০ হাজার বস্তিবাসীকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। ২০০৭ থেকে ০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ঢাকার ২৭ বস্তি থেকে ৬০ হাজার মানুষকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। চলতি বছর ২০১২ সালের ৪ এপ্রিল ঢাকার সবচেয়ে বড় বস্তি কড়াইলে উচ্ছেদ অভিযান করে বাস্তুচ্যুত করা হয় ৭৫২ পরিবারের পাঁচ হাজারের বেশি বস্তিবাসীকে। কোন ধরনের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করেই বস্তিতে পরিচালিত এসব অভিযান চালানো হয়েছে। যুক্তরাজ্যের ডিপার্টমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ডিএফআইডি) ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত ‘ইকোনমিক এম্পাওয়ারমেন্ট অব দ্য পুওরেস্ট’ প্রকল্পের এক গবেষণা থেকে দেয়া গেছে, ২০০৬ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে রাজধানীতে ২৭ বস্তি উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং একজন উচ্ছেদকৃতকেও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়নি।Bosti-1পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৭ সালের দিকে বিশ্বের শহরগুলোর অধিবাসীর সংখ্যা ও গ্রামীণ অধিবাসীর সংখ্যা প্রায় সমান ছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জীবন ও জীবিকার তাগিদে গ্রাম ছেড়ে শহরের দিকে আসতে শুরু করেছে সাধারণ মানুষ। এতে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে শহরের বসতবাড়ীর পরিবেশ। বাড়ছে শহরবাসীর সংখ্যাও। এ বিষয়ে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন- পবার নির্বাহী সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মো. আব্দুস সোবহান বাংলামেইলকে বলেন, ‘অপরিকল্পিত নগরায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এমনটা ঘটছে। দিন দিন বাস্তুহারা মানুষের সংখ্যা বাড়লেও সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না।’ এ জন্য তিনি রাজধানী ঢাকার আয়তন না বাড়িয়ে শহর বিকেন্দ্রীকরণের পরামর্শ দিয়েছেন। এদিকে বিশ্ব বসতি দিবস উপলক্ষে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ‘বস্তিবাসীর অধিকার: পরিবেশ বান্ধব বাসস্থান’ শীর্ষক এক সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে। সেমিনারে বক্তব্য দেবেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। এছাড়া দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান মন্ত্রী বাণী দেয়ার কথা রয়েছে।