যাদের হাতে পরিবার-পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব, তারা নিজেরাই সরকারি নীতিমালার ধার ধারছেন না। পরিবার-পরিকল্পনা অধিদফতরের পদস্থ কর্মকর্তারা পরিবার ছোট রাখা, কম বয়সে মেয়ে বিয়ে না দেওয়ার মূলনীতি ও উদ্দেশ্য-আদর্শ নিজেরাই মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন না বলে অভিযোগ উঠেছে।
অধিদফতরের ২৪ জন মহাপরিচালকের মধ্যে ১৭ জনই ছিলেন তিন বা ততোধিক সন্তানের গর্বিত পিতা! জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বা সুখী পরিবার গঠনের স্লোগান তারা নিজ পরিবারেও বাস্তবায়ন করতে পারেননি। এসব কারণে জন্ম নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে তাদের আন্তরিকতা নিয়েও নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
‘ছেলে হোক মেয়ে হোক, দুটি সন্তানই যথেষ্ট’ স্লোগান দিয়ে জন্ম নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি শুরু হলেও ইতোমধ্যে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে গেছে পরিবার-পরিকল্পনার কার্যক্রম। বর্তমানে ‘আর দুটি নয়-ছেলেই হোক একটি; আর মেয়েই হোক একটি’ স্লোগান তুলে পরিবার-পরিকল্পনার নানা কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে।

অথচ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি এ নীতিমালা শুধু বক্তৃতা, স্লোগান, লিফলেট, নির্দেশনামা কাগজপত্রেই সীমাবদ্ধ থাকছে। অধিদফতরের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী থেকে শুরু করে মহাপরিচালক পর্যন্ত অনেকেই মানছেন না সে আদর্শ।

খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক আ ফ ম রুহুল হক জনসংখ্যাবিষয়ক সভা-সেমিনারে নিজেও পিতা-মাতার নবম সন্তান হিসেবে গর্ব করে বক্তৃতা দেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ কেউ গড়ে তুলেছেন ঢাউস ফ্যামিলি, সন্তান সংখ্যায় অর্ধডজনের কোটাও ছাড়িয়ে গেছেন তারা।
অধিদফতরের ২৪ জন মহাপরিচালকের মধ্যে মাত্র পাঁচজন কর্মকর্তা ‘কর্মসূচির আলোকে’ নিজেদের পরিবার এক বা দুই সন্তানে সীমিত রাখতে পেরেছেন। বাকি ১৭ জনই ছিলেন তিন বা ততোধিক সন্তানের জন্মদাতা গর্বিত পিতা! বাংলাদেশ প্রতিদিনের অনুসন্ধানে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।(SORCE- DALIY SALAKER S2ONGBAD DATE: 08/12/2011

পরপর দুই দফায় মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এম তবিবুর রহমান শুধু চার সন্তানেই বিশ্বাসী ছিলেন না, একাধিক বিয়ের ব্যাপারেও তার আগ্রহের প্রমাণ দিয়ে গেছেন।
প্রায় একইভাবে শফিউদ্দিন আহম্মেদ, এ কে এম রফিকুজ্জামান, মোহাম্মদ নাজমুল হক, তসলিমুর রহমান, কর্নেল আবদুল লতিফ মলি্লকসহ ১৭ জন মহাপরিচালক ছিলেন তিন, চার কিংবা পাঁচ সন্তানের পিতা। অধিদফতরের পরিচালক, সহকারী পরিচালক, উপপরিচালক, প্রকল্প কর্মকর্তা, ফিল্ড সুপারভাইজার, ক্লিনিক্যাল ডাক্তারসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকে অধিক সন্তান জন্ম দেওয়ার ব্যাপারেই বেশি আগ্রহ দেখিয়েছেন।
উপপরিচালক থেকে মহাপরিচালক পর্যন্ত আড়াই শতাধিক কর্মকর্তার মধ্যে মাত্র দুজন কর্মকর্তা-দম্পতি জন্ম নিয়ন্ত্রণের স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন বলে জানা গেছে। ৫৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কাজ করলেও বাস্তব চিত্র অন্য রকম। একশ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারীর স্বেচ্ছাচারিতায় জন্ম নিয়ন্ত্রণের গৌরবোজ্জ্বল কর্মসূচি ভেস্তে যেতে বসেছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ের একটি গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার আগের চেয়ে অনেকটা কমলেও তা আশপাশের দেশের তুলনায় এখনো অনেক পিছিয়ে।

এ দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার যেখানে ১.৩৯, সেখানে চীনে এ হার ০.৬, শ্রীলঙ্কায় ০.৫, থাইল্যান্ডে ০.৭ এবং মিয়ানমারে মাত্র ০.৯ পর্যায়ে রয়েছে।

এ ব্যাপারে অধিদফতরের মহাপরিচালক এম এম নিয়াজউদ্দিন জানান, পরিবার-পরিকল্পনা কার্যক্রমে গতিশীলতা আনতে সরকার বেশকিছু নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। ক্লিনিক্যাল পদ্ধতির বন্ধ্যাকরণ, আইইউডি ও ইমপ্ল্যান্ট কার্যক্রমের জন্য টাকার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে, ফলে দ্বিগুণ ভাতা পাবেন সেবাগ্রহীতারা। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আরও সচেতন করে তুলতে হবে।
কামরুজ্জামান বাচ্চু
পটুয়াখালীর বাউফলে মূল ভূখ- থেকে বিচ্ছিন্ন ছোটবড় ১১টি চরে প্রায় ১২ হাজার লোকের বসতি। এখানে প্রতি পরিবারে গড় লোকসংখ্যা ৬ জন। অধিক সন্তান, অধিক উপার্জন। এ বিশ্বাসের কারণে চরবাসীরা জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ব্যবহার করতে নারাজ। তাই বছরের পর বছর বাড়ছে মানুষ, বাড়ছে নতুন বাড়িঘর। কমছে আবাদি জমি। উপজেলার এ চরাঞ্চলের নিম্ন আয়ের লোকজনকে পরিবার পরিকল্পনার বিষয়ে আগ্রহী করে তুলতে হবে। তা না হলে গ্রামীণ অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়বে বলে মনে করেন এলাকার সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের প্রোজেক্ট ম্যানেজার হেমায়েত উদ্দিন জানান, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সরকারী-বেসরকারী উদ্যোগ থাকলেও বাউফলে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে জনবল সঙ্কট, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলগুলো দুর্গম এলাকা হওয়ায় পরিবার পরিকল্পনার বাস্তবায়ন কার্যক্রম আলোর মুখ দেখছে না। তিনি আরও বলেন, উপজেলার বিশাল জনগোষ্ঠীর এক বড় অংশ বসবাস করে অনুন্নত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন দুর্গম চরাঞ্চলে। যেখানে পৌঁছায় না জন্মনিয়ন্ত্রণের সেøাগান ‘দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভাল হয়।’ চরাঞ্চলে বসতির মধ্যে ধর্মান্ধ ও কুসংস্কার আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। উপজেলার চরমিয়াজান, চরবেরেট, চরদিয়ারা, চরঅডেল, চরকচুয়া, চরফেডারেশনসহ প্রায় ১৮টি চরের বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন ঘুরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির অস্বাভাবিক চিত্র পাওয়া গেছে।
চরমিয়াজানের গ্রাম্যচিকিৎসক আবদুল বারেক সিকদার জানান, চরাঞ্চলে কোন প্রকার আধুনিক চিকিৎসাসেবা না থাকায় অনাকাক্সিক্ষত গর্ভপাত ঘটাতে গিয়ে মারা পড়ছে গর্ভবতী মায়েরা। সামান্য সচেতনরা উপজেলায় এসে গোপনে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি বা ইনজেকশন কিনে নেয়Ñ তাও আবার স্বামী বা পরিবারের সদস্যদের না জানিয়ে এসব ব্যবহার করতে হয়। চর ফেডারেশনের আলম ফকিরের স্ত্রী ফিরোজা বেগম (২৫)। তার বিয়ে হয় ১০ বছর আগে। বাল্যবিয়ে হলেও ফিরোজা এখন ৩ মেয়ে ১ ছেলের জননী। তার স্বামী আরও সন্তান নিতে চায়। এ চরের গৃহবধূ শাহিনুরের ৬ সন্তান, হেলেনার ৫ সন্তান, হাসিনার ৪ সন্তান। এদের প্রত্যেকের স্বামী আরও সন্তান নিতে চায়। তাদের ধারণা হচ্ছে, বেশি সন্তান হলে ভূমিদস্যু লাঠিয়ালদের হাত থেকে ফসল রক্ষা করতে পারবে। পাশাপাশি আয় রোজগারও বেশি হবে। এ চরের শতকরা ৬০ জন কৃষক, ৩০ জন জেলে ও ১০ জন লোক নিয়মিত কোন পেশায় নেই।
পাঁচ সন্তানের জননী চরমিয়াজানের রেহেনা বেগম (৩৫) বলেন, আল্লাহর দেয়া সৃষ্টিতে বাধা দিলে তিনি গোস্বা হন।
একই চরের মাজেদা বিবি ৬ সন্তানের জননী। তার ছেলে নেই একটিও। তাই তিনি ছেলে না হওয়া পর্যন্ত যত সন্তান নিতে হয়, ততবার নেবেন।
জনসংখ্যার এ অনিয়ন্ত্রিত অবস্থার বিষয়ে বাউফল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিক্যাল অফিসার ডা. মোঃ মনজুরুল ইসলামের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, বাউফল মূল ভূখ-ের জনসংখ্যা প্রায় নিয়ন্ত্রিত। আগের মতো লোক বাড়ছে না, মানুষ সচেতন হয়েছে। তবে দুর্গম চরাঞ্চলে যানবাহন না থাকা, নিরাপত্তার অভাব, সংশ্লিষ্ট বিভাগে জনবল সঙ্কটের কারণে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তা ছাড়া ওই সব চরে লোকজন অশিক্ষিত ও ধর্মান্ধতার কারণে নিয়ন্ত্রণে রাখা কষ্ট সাধ্য। এ জন্য প্রয়োজন শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নসহ সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা।