3

উত্পাদনখরচউঠছেনাআমনধানে (SORSE: DALIY BANGLADESH PROTIDIN (08/12/2011)
এসএমআলমগীর:
বাড়িতে নতুন ধান এলেও ফিকে হয়ে গেছে কৃষকের হাসি। উত্পাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উঠছে না খরচ। ঘরে যা ধান আসছে-ধারদেনা এবং মহাজনের ঋণের টাকা শোধ দিতেই তা চলে যাচ্ছে। সংসারের জন্য এক মণ ধানও গোলায় তুলতে পারছেন না।
ধান নিয়ে এক হাট থেকে আরেক হাট ঘুরেও ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে না। পাটের পর ধানে লোকসান দিয়ে দিশেহারা কৃষক। অথচ সরকারিভাবে ধান ক্রয়ের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। যদিও কৃষি বিশেষজ্ঞ
এবং অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সরকার ধানের দাম নির্ধারণ করে দিলে কৃষককে লোকসানে পড়তে হতো না। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান বলেন, ‘ভালো দাম না পেলে কৃষক ধানচাষে আগ্রহ হারাবেন।
এতে করে সরকার ২০১৩ সালের মধ্যে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে তা ব্যাহত হবে। সবার আগে কৃষককেবাঁচাতেহবে,কৃষকযাতেতারকষ্টের উত্পাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পান তা নিশ্চিত করতে হবে।’
আমন ধানের আগে পাটেও কৃষককে দিতে হয়েছে লোকসান। সারা বছর পাটের মণ ছিল দেড় হাজার টাকার ওপরে। কৃষকের ঘরে নতুন পাট আসার সঙ্গে সঙ্গে দাম অর্ধেকে নেমে যায়। পাট বিক্রি হতে থাকে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা মণে।
বড় আশা নিয়ে কৃষক আমন ধানের চাষ করেন। আবারও ধাক্কা খেতে হয় কৃষককে। ৮০০ টাকার ধানের দাম নেমে আসে মণপ্রতি ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকায়। কৃষক তার উত্পাদন খরচই তুলতে পারছেন না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, আমন ধান চাষে একরপ্রতি কৃষকের খরচ হয়েছে ২১ থেকে ২২ হাজার টাকা। অথচ কৃষক পাচ্ছেন ১৯ থেকে ২০ হাজার টাকা। প্রতি একরে লোকসান দিতে হচ্ছে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা।
মূলত এই লোকসানের পরিমাণটা বেড়েছে বীজ, সার, পানি, কীটনাশক এবং শ্রমিক খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায়। অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, এক একর জমির ধান কাটা ও মাড়াই বাবদ খরচ হয় ৩ হাজার ৫০০, ধান লাগানো খরচ আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার, নিড়ানি খরচ আড়াই হাজার, হালচাষ সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার, সার সাড়ে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার, কীটনাশক দুই হাজার ও বীজ দেড় হাজার টাকা।
সবমিলিয়ে খরচ হচ্ছে ২১ হাজার ৫০০ টাকা। প্রতি একর জমিতে ধানের উত্পাদন হয়েছে গড়ে ৪০ মণ। প্রতি মণ ৫০০ টাকা দরে দাম পাওয়া যাচ্ছে ২০ হাজার টাকা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে আরও জানা যায়, চলতি আমন মৌসুমে মোট ৫৮ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে ধানচাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে ৪২ লাখ হেক্টর জমিতে উচ্চফলনশীল জাতের রোপা ও সাড়ে ১২ লাখ হেক্টর জমিতে স্থানীয় জাত এবং চার লাখ হেক্টর জমিতে বোনা আমন চাষের লক্ষ্য নির্ধারিত ছিল।
উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ কোটি ৩৩ লাখ টন। গত বছর মোট ৫৪ লাখ হেক্টর জমিতে রোপা ও ৪ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে বোনা আমনের আবাদ করা হয়। উত্পাদন হয় এক কোটি ৩১ লাখ টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক কৃষিবিদ মো. হাবিবুর রহমান সকালের খবরকে বলেন, ‘এবার আবহাওয়া ভালো থাকায় এবং সময়মতো বীজ, সার, কীটনাশক ও পানির ব্যবস্থা করায় বাম্পার ফলন হয়েছে।
আমন ধান নিয়ে কৃষকের বিড়ম্বনার আরও চিত্র তুলে ধরেছেন সকালের খবরের জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধিরা :
দিনাজপুর প্রতিনিধি জানান, আমনের বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। ব্যবসায়ীরা ধীরগতিতে ধান কেনায় কৃষকরা ধানের দাম পাচ্ছে না।
ধান বিক্রি করতে আসা কাহারোল উপজেলার কৃষক আবদুল্লাহ ও জলিল জানান, ধান বিক্রি করতে এসে আগের হাটে দাম না পেয়ে ফেরত নিয়ে গিয়েছিল। এবার তারা দাম না পেলেও ধান বিক্রি করে দিয়েছে।
রংপুর অফিস জানায়, গত কয়েক দিন আগে রংপুরে ধানের বাজার ছিল প্রতি বস্তা (২৮ কেজি) ৪৭০-৪৮০ টাকা। যত দিন যাচ্ছে ততই বাজারে ধানের দর কমছে। ধান কিনে লোকসান গুণতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদেরও।
এ কারণে অনেক ব্যবসায়ী ধান কেনা বাদ দিয়ে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন গুদাম ঘরে। এ অঞ্চলে কৃষকের একমাত্র ভরসা ধানে। দর কম হলেও ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ধান কাটা-মাড়াইয়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বিক্রি করতে হচ্ছে।
উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের কৃষক আতাউর রহমান বাজারে ধান এনেছিলেন। ব্যবসায়ীরা দাম কম বলায় তিনি ধান বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন। একই অবস্থা দামোদরপুর ইউনিয়নের মোস্তফাপুর গ্রামের ক্ষুদ্র কৃষক সাইদ আলীর। তিনি বলেন, ‘কষ্ট করে ধান আবাদ করেছি লাভের আশাত।
কিন্তু হামার খরচের পাইশায় উঠবার নেয়। ধান বিক্রির জন্য বাজারোত গেইলেও ওরা (ব্যবসায়ী) নিবার চায় না।’
চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জানান, পাটের আবাদ করে লোকসানের পর এবার আমন ধান আবাদ করে আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে হাজার হাজার কৃষক। অনেক ক্ষতি এড়াতে অন্য আবাদে ঝুঁকে পড়ছে।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার পীরপুর গ্রামের চাষি মানজের আলী জানান, চলতি মৌসুমে তিনি আমন আবাদ করেছিলেন সাত বিঘা জমিতে।
ফলনও ভালো হওয়ায় আশায় বুক বেঁধেছিলেন পাটের লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারবেন; কিন্তু চুয়াডাঙ্গার বাজারে এখন আমন (মোটা) ধান ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে।
চিকন স্বর্ণা বিক্রি হচ্ছে ৬০০ টাকায়। এখন কৃষক হতাশ।
বাজারে ধান বিক্রি করতে আসা জীবননগর উপজেলার বৈদ্যনাথপুরের কৃষক আক্কাছ আলী জানান, তিনি স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে আমন আবাদ করেছিলেন তিন বিঘা জমিতে। সার, ডিজেল, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিঘাপ্রতি খরচ হয়েছিল আট থেকে নয় হাজার টাকা।
কিন্তু ধান বিক্রি করে এখন আবাদের খরচই উঠছে না। মহাজনের টাকা পরিশোধ করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারছেন না।
নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, ধানের বাজারে প্রতিদিনই দাম কমছে। সরকারিভাবে দাম নির্ধারণ না করায় হতাশা প্রকাশ করেছে তারা। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি মণ মোটা ধানে ৩৫ থেকে ৪০ এবং চিকন ধানে ৫০ থেকে ৬০ টাকা কমেছে।
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে কুষ্টিয়া জেলার হাটবাজারগুলোয় আবারও কমে গেছে ধানের দাম। মণপ্রতি ১০০ থেকে ২০০ টাকা দাম কমায় কৃষক চরম হতাশ। আমন ধান কাটার শুরুতে এসব বাজারে ধান বিক্রি শুরু হয় ৬৮০ থেকে ৬৯০ টাকা মণ দরে। কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই দাম ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় নেমে এসেছে। খোকসার শমোশপুর হাটে এক সপ্তাহ আগে যে ধান বিক্রি হয়েছে ৭২০ টাকা মণ দরে, সেই একই ধান বর্তমান বাজারে ৫০০ থেকে ৫৩০ টাকা মণ দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
হঠাত্ করে ধানের দরপতনের কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুরোদমে ধান কাটার মৌসুম শুরু হয়ে গেলেও সরকারিভাবে মূল্য নির্ধারণ ও সংগ্রহ অভিযানের ঘোষণা না দেওয়ায় আমন ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কৃষক। এদিকে বাজারে ধানের মূল্য না থাকায় একশ্রেণীর সুদখোর মহাজন কোমর বেঁধে বাকি টাকা আদায়ে মাঠে নেমেছে। মহাজনের চাপে কৃষকরা কম মূল্যে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে তারা চোখে শস্যের ফুল দেখতে শুরু করেছে।
ঝিনাইদহ প্রতিনিধি জানান, ঝিনাইদহে এবার আমন আবাদে বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। উত্পাদন খরচের চেয়ে ধানের বাজার অনেক কম হওয়ায় কৃষকের হাসি মলিন হয়ে গেছে। ফয়লা গ্রামের কৃষক আতিয়ার রহমান জানান, ‘মহাজন এবং দায়দেনা মেটাতে গিয়ে তার ঘরে এক মণ ধানও নেই।
’ বিষয়খালী গ্রামের কৃষক ওবাইদুল হক জানান, কৃষি উপকরণের দাম অত্যন্ত বেশি অথচ কৃষকের উত্পাদিত ফসলের দাম কম। ফলে কৃষক পরিবারের মধ্যে চলছে হাহাকার। তিনি সকালের খবরকে জানান, আমাদের কৃষকদের দুঃখ-দুর্দশার কথা দেশবাসী-সরকারকে জানান, পরিবার পরিজন নিয়ে যেন দু’বেলা দু’মুঠো খেয়ে বেঁচে থাকতে পারি।

বাউফল সংবাদদাতা জানান, বাউফলে হেমন্তলক্ষ্মী আগাম জাতের আমন কাটার ধুম চলছে; কিন্তু বাজারে ভালো দাম না থাকায় বিষণ্নতার ছাপ বর্গাচাষির মুখে। বীরপাশা গ্রামের চাষি খলিলুর রহমান জানান, বর্ষার আউশ মৌসুমে জমির মালিকের সঙ্গে অর্ধেক ভাগে ধান ভাগাভাগি হয়েছে। এবার খন্দ মৌসুমে সার-ওষুধের খরচ জমির মালিক দেওয়ায় বর্গাচাষি হিসেবে তিনি পাবেন তেভাগার অংশ।
অন্যান্য জিনিসপত্রের তুলনায় বাজার দর না বাড়লে ছেলেমেয়ে নিয়ে তেল, লবণ, হলুদ, মরিচ জুটিয়ে দু’বেলা সারা বছর খেতে পারবেন না তিনি। পাঁচ মণ ধান বিক্রি করতে এনে বাড়ি ফেরত নেওয়া চরমিয়াজানের চাষি শাহ আলম বলেন,
‘আল্লায় জানে, ধানের দাম কুইমগা গ্যাছে কি লইগ্যা। তয় চাষাগো দিগে চাইয়া হারা বচরের লইগ্যা মাইনসের উচিত এ্যকটা দর ঠিক কইরা দেওয়া। এবারও দর না অইলে আর চাষি কাম ছাইড়া দিমু। ঢাকা যাইয়া লেবারি করমু।’
পার্বতীপুর সংবাদদাতা জানান, দিনাজপুরের পার্বতীপুর হাটবাজারে আমন ধানের মূল্য কম হওয়ায় কৃষকরা বিপাকে পড়েছে। এখন বাজারে ধানের মূল্য খুবই কম। কৃষি উপকরণের প্রতিটির মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। সার, বিষ ও নানা খরচ মিলে একরপ্রতি খরচের অতিরিক্ত বোঝা চাষিদের উপরেই পড়ছে। এরপর ফড়িয়া মহাজনরা হাটে ইচ্ছামতো জায়গা দখল করে, বাকিতে ধান নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এমনকি সারা দিন কৃষকদের বসিয়ে রাখে। এতে করে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও মধ্যবিত্ত চাষিরা পড়েছে চরম বিপাকে।