7

ভাঙন তো ঠ্যাকে না, থাকার জাগা দ্যাও’

গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার গোবিন্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন। ভাঙতে ভাঙতে যমুনা নদী একেবারে কাছে চলে আসায় কর্তৃপক্ষ ভবনটি তড়িঘড়ি করে ঠিকাদারের হাতে তুলে দিয়েছে। ছবিটি গতকাল তোলা।

‘এক ভাঙা, দুই ভাঙা নয়, ২৫ ভাঙা দিছি। ভাংতির কতা কবার গেলে বুকের ভেতর ক্যামন করি ওটে। বড় বড় ছাড়েরা আসে আর যায়। ভাঙন তো ঠ্যাকে না। হামাক থাকার জাগা দ্যাও।’ ভাঙন নিয়ে গতকাল শুক্রবার দুপুরে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার সদর ইউনিয়নের গোবিন্দি গ্রামের বৃদ্ধা মাজেদা খাতুন (৫৮) এভাবেই তাঁর আকুতি তুলে ধরেন।
মাজেদার বাড়ির পাশেই ভাঙা হচ্ছে গোবিন্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন। ভাঙতে ভাঙতে যমুনা নদী একবারে স্কুলের কাছে চলে আসায় সম্প্রতি কর্তৃপক্ষ বিদ্যালয় ভবনটি নিলামে তোলে। ৭০ হাজার টাকায় ১৯৯৭ সালে পাঁচ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনটি তড়িঘড়ি করে ঠিকাদারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। কারণ যেকোনো মুহূর্তে ভবনটি নদীগর্ভে চলে যেতে পারে।
শ্রমিকরা গাঁইতি, শাবল দিয়ে ভবনটির ছাদ ভাঙছে, আর নিচে দাঁড়িয়ে ছলছল চোখে তা দেখছে ওই স্কুলের ছাত্র আরজিনা, মকসেদুল, মমতা, সজীব, শাকিল ও তাপসীরা। ওদের সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন বিদ্যালয়টির অফিস সহকারী সোহরাব হোসেন। মকসেদুল বলল, ‘রমজানের আগেও আমরা এখানে ক্লাস করেছি। রোজার জন্য স্কুল বন্ধ দিল। তারপর হঠাৎ করে দেখি নদী ভাঙনের জন্য স্কুল ভাঙা শুরু। ইসকুল যদি না থাকে তাহলে আমরা এখন কোথায় পড়তে যাব।’
সাঘাটা ইউপি চেয়ারম্যন মোশারফ হোসেন সুইট জানালেন, যমুনার ভাঙনে গেবিন্দির মাদ্রাসা, ঈদগাহ মাঠ, কবরস্থান কিছুই রক্ষা পায়নি। এর আগে হাটবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও নদীগর্ভে চলে যায়। পার্শ্ববর্তী হলদিয়া ইউনিয়নের কমিউনিটি ক্লিনিকটিও ভাঙনের কারণে গত বৃহস্পতিবার নিলামে দেওয়া হয়েছে। দুই-তিন দিন হলো বাঁশহাটার বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে।
দুই শ মিটার দূরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঠিকাদারের লোকজন ভাঙন প্রতিরোধের কাজ করছে। এলাকাবাসীর একজন বিক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, ‘ওগল্যা লোক দেখানি কাম। সময়ের কাম সময়ে করলে এগল্যা গেলো না হয়!’
সাঘাটা ইউপি চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন সুইট অভিযোগ করলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের অবহেলায় গোবিন্দির এই দশা। একটি বিশেষ মহলের সঙ্গে সিন্ডিকেট করে তারা জনগণের টাকা নয়-ছয় করছে। যে সময়ে কাজ করার কথা ছিল সেই সময় যদি এই ভাঙন প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হতো তাহলে গোবিন্দি, কবরস্থান ও ঈদগাহ মাঠ নদীগর্ভে বিলীন হতো না। তিনি জানালেন, তার ইউনিয়নের ১৪ গ্রামের মধ্যে ৯টি পুরো অথবা ৭৫ ভাগ নাই হয়ে গেছে। গত দুই বছরে অন্তত দুই হাজার পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে পার্শ্ববর্তী এলাকায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।
গোবিন্দি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরেই ফুলছড়ির ভাঙনপ্রবণ কামারপাড়া। গত এক মাসে এখানকার ১৪০ পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। পানি ও ভাঙন বৃদ্ধি পেলে পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ শুরু করে। তার আগেই তীব্র ভাঙনে সর্বস্ব হারায় মানুষ। গৃহবধূ কৃষ্ণা রানী বললেন, ‘ফুলছড়ি কলেজ মাঠে আশ্রয় নিয়েছি। বাথরুম, টিউবওয়েলের অভাবে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছি।’
গজারিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মনতোষ রায় মিন্টু বললেন, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়ার নির্দেশের পরও সময় মতো কাজ শুরু করেনি পাউবো। অথচ সেই সময় ঠিকাদাররা কাজ করতে রাজি ছিল। এই পরিবারগুলোর সর্বনাশের জন্য পাউবোই দায়ী। তিনি অভিযোগ করেন, এখন ভরা নদীর তীর সংরক্ষণে জিও টেক্সটাইল ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। এসবের সংখ্যা গণনা নিয়ে এলাকাবাসী সন্দেহ প্রকাশ করছে।
এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল আউয়াল বলেন, ভাঙন ঠেকাতে পাউবোর ব্যর্থতার অভিযোগ সত্যি নয়। অর্থ বরাদ্দ ও প্রাপ্তি সাপেক্ষে কাজ করা হয়। তা ছাড়া ভাঙন আক্রান্ত এলাকা চিহ্নিত হওয়ার পর সেখানে কাজ করতে হয়। বর্তমান সময়ে টাস্ক ফোর্স অনুমোদন না দিলে একটি বস্তা ফেলারও সুযোগ নেই।
পাউবো সূত্র জানায়, গাইবান্ধা সদর, সাঘাটা, ফুলছড়ি ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় তিস্তা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘটের তীরে প্রায় ২১ কিলোমিটার এলাকা ভাঙনকবলিত। ভাঙন ঠেকাতে একেক মিটার এলাকার জন্য প্রয়োজন হয় সাড়ে সাত লাখ টাকা। এ পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ড এসব এলাকার জন্য বরাদ্দ করেছে মাত্র ৯ কোটি টাকা, যা দিয়ে ওই ২১ কিলোমিটার এলাকায় ৯টি পয়েন্টে কোনোমতে ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।