মাদকের কবলে ঢাকার পথ-শিশুরা

  • ৫ ডিসেম্বর ২০১৩


Image captionঢাকার সড়কগুলোতে অনেক পথ-শিশুকেই দেখা যায় প্রকাশ্যে ড্যান্ডি নামের এক ধরনের মাদক সেবন করতে।

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় সরকারি হিসেবে দুই লাখের মতো পথ-শিশু রয়েছে, যাদের বয়স আঠারো বছরের কম।

অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যর মতো একেবারে মৌলিক অধিকারের সবগুলো থেকেই বঞ্চিত এসব শিশুরা।

বিবিসির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ঢাকায় যেসব পথ-শিশু বসবাস করে, তাদের অধিকাংশই মাদকাসক্ত।

বিশেষ করে ড্যান্ডি নামক এক ধরনের নতুন এবং সহজলভ্য মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছে এসব শিশুরা।

এমনকী আট থেকে বারো বছর বয়স্ক শিশুদের ঢাকার রাস্তায় প্রকাশ্যেই ড্যান্ডি সেবন করতে দেখা গেছে।


Image captionপলিথিন প্যাকেটে ঢোকানো সল্যুশন নামে এক ধরণের আঠা। এই হল ড্যান্ডি।

নোংরা কালিঝুলি মাখা ছেলেটি। মাথায় উষ্কখুষ্ক চুল। পরনে শতচ্ছিন্ন টি-শার্ট আর হাফপ্যান্ট। বয়স বড়জোর দশ কি এগারো।

ঢাকার একেবারে কেন্দ্রস্থলে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম নামে যে বড়সড় খেলার মাঠটি রয়েছে, সেটির গ্যালারির ব্যালকনিতে বসে ঝিমুচ্ছিল সে।

তার এই অবস্থা কেন, জানতে চাইলে জড়ানো গলায় জবাব আসে, ”ড্যান্ডি খেয়ে”।

ছেলেটি মাদকাসক্ত।

সম্প্রতি বাংলাদেশের শহর এলাকাগুলোতে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়া ড্যান্ডি নামক একধরণের মাদক গ্রহণ করে সে।

মাদকটির প্রভাব যে কতটা তীব্র, সেটা বোঝা গেল ছেলেটির অবস্থা দেখে।

তার কথাবার্তা একেবারেই বোঝা যাচ্ছিল না।

বেশ খানিকক্ষণের আলাপচারিতায় যেটুকু জানা গেলো, পথেই তার ঘরবাড়ি। মা নেই, বাবা থেকেও নেই। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করার পর সৎ-মায়ের অত্যাচারে ঘর ছাড়ে সে।

খোঁজ খবর নিয়ে জানা যাচ্ছে, ড্যান্ডি কোনও প্রচলিত মাদক নয়। একধরণের আঠা। মূলত সল্যুশন নামে পরিচিত। এটাই ড্যান্ডির মূল উপাদান।

এই আঠা একটি পাতলা পলিথিন প্যাকেটে ভরে সেই পলিথিনের খোলা অংশ মুখে লাগিয়ে জোরে জোরে নিশ্বাস নেয়ার মাধ্যমেই ড্যান্ডি সেবন করে আসক্তরা।

ঢাকার রাস্তাঘাটের দুপাশে আজকাল এমন অনেক পথ-শিশুকেই দেখা যায় এভাবে পলিথিনে মুখ লাগিয়ে প্রকাশ্যে ড্যান্ডি সেবন করতে।


Image captionপ্রকাশ্যেই চলছে গাঁজা সেবনের প্রস্তুতি।

স্টেডিয়াম থেকে আরেকটু এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ে পল্টনের খোলা ময়দান।

জায়গাটা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন বঙ্গভবন থেকে মাত্র কয়েকশ গজ দূরে।

সেখানে এখন ইঁটের রাস্তা বানিয়ে গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সেই পার্কিং এলাকায় ছোট ছোট জটলা। এরা সবাই ছিন্নমূল মানুষ।

এদের মধ্যে আছে, নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-যুবা এবং প্রচুর শিশু।

প্রত্যেকটি জটলা থেকেই ভেসে আসছিল উৎকট গন্ধ।

একটু ঘোরাঘুরি করতেই বোঝা গেল, এখানে গাঁজা সেবন চলছে প্রকাশ্যেই।

কিছুটা দূরে মাঠের মধ্যে ৪টি শিশু, বয়স কারোরই বারো বছরের বেশি নয়, তারা কিছু একটা করছে।

কাছে যেতেই সেখান থেকে দুজন ছুটে পালায়। বাকি দুজন বসে আছে, তারা তাদের সামনে থাকা সিগারেট, গাঁজা এবং অন্যান্য সরঞ্জাম লুকোনোর চেষ্টা করে।

এই শিশুরা গাঁজা সেবনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

শিশুদের নিয়ে কাজ করে এমন বিভিন্ন সংস্থায় গিয়ে দেখা যাচ্ছে, পথ-শিশুদের নিয়ে কোনও সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই।

তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো দেশটির সর্বশেষ আদমশুমারিতে ভাসমান মানুষদের সম্পর্কে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে বলছে, দেশটিতে চার লাখের মতো পথ-শিশু রয়েছে, যার অর্ধেকই অবস্থান করছে রাজধানী ঢাকাতে।

অন্যদিকে জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ বলছে, বাংলাদেশে পথ-শিশুর সংখ্যা দশলাখের বেশি। ঢাকার হিসেব অবশ্য তাদের কাছে নেই।

দুদিন ধরে ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে ঘুরে ঘুরে যত পথ-শিশুর সাথে সংবাদদাতার কথা হয়েছে তাদের সবাই কোনও না কোনও মাদকে আসক্ত।

ইউনিসেফের একজন কর্মকর্তা আরিফা এস শারমীন বলছেন, ‘সঠিক হিসেব বলা কঠিন। তবে কাজের অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের কাছে যেসব তথ্য আসে তাতে দেখা যাচ্ছে পথ-শিশুদের মধ্যে মাদক গ্রহণের হার বিপদসীমা পেরিয়ে গেছে অনেক আগেই’।

ঢাকার চানখারপুল এলাকায় গিয়ে দেখা যায় সারি সারি দোকান।

এসব দোকানীরা পথ-শিশুদের কুড়িয়ে আনা প্লাস্টিকের বোতল, কাগজ ইত্যাদি কিনে নিচ্ছে।

এসব দোকানের আশপাশেই ঘোরাঘুরি করছে মাদক বিক্রেতারা।

তারা এমনকী বিবিসির সংবাদদাতাকেও তাদের সম্ভাব্য ক্রেতা মনে করে মাদক বিক্রি করবার চেষ্টা চালায়।

সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, ঢাকার পথ-শিশুদের মধ্যে সবচাইতে জনপ্রিয় হচ্ছে ড্যান্ডি। তারপরেই রয়েছ গাঁজা, ইয়াবা, পেথিড্রিন ইত্যাদি। এমনকী অনেক শিশু হেরোইনেও আসক্ত।

ইউনিসেফ কর্মকর্তা মিস শারমীন বলছিলেন, ”পথ-শিশুদের কাছে মাদক বিক্রির জন্য একটা সিন্ডিকেট কাজ করে। ভাঙ্গারী ক্রেতারাই শিশুদের কাছ থেকে ভাঙ্গারী কিনে নেয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই শিশুদের হাতে মাদক তুলে দেয়।”


Image captionমাদক সেবনের পর দিনের অধিকাংশ সময়ই এক ধরণের ঘোরের মধ্যে কাটে আসক্ত শিশুদের।

গত দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের পথ-শিশুদের নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর মাহবুব উদ্দীন আহমেদ।

তিনি দেখতে পেয়েছেন, পথ-শিশুদের মধ্যে শৈশবে নানা পারিবারিক নির্যাতন যৌন হয়রানি ইত্যাদির শিকার হয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া শিশুদের সংখ্যাই বেশি।

কিছু শিশুর জন্মই হয় পথে, তাদের অতি-দরিদ্র বাবা-মা ভাসমান থাকবার কারণে।

এদের বেশিরভাগই বিপথে থাকা বড়দের কবলে পড়ে মাদকাসক্ত হয়।

কারণ হিসেবে ড. আহমেদ বলছেন, মাদকাসক্ত একটা শিশুকে দিয়ে যেকোনো কাজ করিয়ে নেয়া যায়।

”রাষ্ট্রের তাদের ব্যাপারে একেবারেই কোনও উৎসাহ নেই”, বলছিলেন ড. আহমেদ।

তার ভাষায়, ”এরা ভোটার নয়। তাই রাজনৈতিকভাবে এসব শিশুর কোনও মূল্য রাষ্ট্রের কাছে নেই। সামাজিকভাবেও এরা বিবর্জিত গোষ্ঠীর সন্তান। ফলে সমাজও তাদেরকে এড়িয়ে চলতে চায়।”

অবশ্য সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যাচ্ছে, এই শিশুদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনবার জন্য চাইল্ড সেনসিটিভ সোশাল প্রোটেকশন ইন বাংলাদেশ বা সিএসপিবি নামে একটি প্রকল্প আছে।

এই প্রকল্পের পরিচালক ওমর ফারুক বলছিলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের কিছু ড্রপ ইন সেন্টার রয়েছে, যেখানে আসক্ত শিশুদের এনে চিকিৎসা ও পুনর্বাসন দেয়ার চেষ্টা করা হয়।

যদিও এই উদ্যোগ যে প্রয়োজনের তুলনায় একদমই যথেষ্ট নয়, তাও স্বীকার করে নেন মি. ফারুক।

সংবাদদাতার কথা হয় একটি ছেলের সাথে, সে তার বয়স উল্লেখ করছিল বারো কি তেরো।

এরইমধ্যে সে চুরির দায়ে একবার জেল খেটে এসেছে। সে একজন মাদকাসক্ত।


Image captionআসক্তদের অনেকেরই শরীরে দেখা যায় এ ধরণের কাটাকুটির দাগ। জানতে চাইলে জবাব আসে, কষ্ট ভুলে থাকার জন্য নিজেরাই এমন কাটাকুটি করে তারা।

ছেলেটি জানায়, সে গ্রেপ্তার হবার পর পুলিশের কাছে বয়স বাড়িয়ে আঠারো উল্লেখ করে এবং একারণে তাকে কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে না পাঠিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারেই রাখা হয়।

অথচ তাকে দেখে কোনোভাবেই মনে হবে না তার বয়স আঠারো হয়েছে।

সে গাঁজা, ইয়াবা, হেরোইন, পেথিড্রিন সব ধরনের মাদকেই আসক্ত বলে জানায়। একসময় সে ড্যান্ডি সেবন করতো, কিন্তু এখন ছেড়ে দিয়েছে।

রাজনৈতিক সহিংসতা চলাকালে যানবাহন ভাংচুর-সহ নানা সহিংসতামূলক কার্যকলাপে লিপ্ত থাকে বলে জানায় সে। সব রাজনৈতিক দলের হয়েই সে কাজ করে।

তবে তার মূল পেশা চুরি করা।

ফিরে আসি পল্টন ময়দানে। এরই মধ্যে সেখানে রাতের অন্ধকার নেমে এসেছে।

পল্টন ময়দানে এখন শত শত মানুষ। কেউ আছে সপরিবারে, শিশু সন্তান কোলে নিয়ে রান্নার জোগাড়যন্ত্র করছে।

ছোট ছোট দলে বসে আছে কিশোর, তরুণ, বৃদ্ধরা। অনেকেই তাস খেলছে। প্রায় সবার মুখেই সিগারেট।

গাঁজার কটু গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে বাতাস।

শিশুরাও গাঁজা সেবন করছে।

অনেক কিশোরী আর তরুণীকে দেখা গেলো সাজগোজ করতে।

সস্তা ছোট্ট আয়না হাতে নিয়ে মুখে মাখছে কড়া মেকআপ।

সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগত।