জলবায়ু পরিবর্তনে দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পাল্টে যাচ্ছে বাংলাদেশের ঋতুগুলোর চিরচরিত বৈশিষ্ট্য। এক সময় বাংলাদেশে গ্রীস্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত এসব ঋতুর আগমন ও প্রস্থানের বিষয়টি স্পষ্ট অনুভব করা গেলেও জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে প্রকৃতির এ নিয়মে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তনে বা বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভূমিকা নগণ্য। কিন্তু সৃষ্ট পরিস্থিতিতে উন্নয়নশীল দেশের দরিদ্র জনগণই অধিক ক্ষতির শিকার হতে হচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের মতো কৃষি নির্ভরশীল দেশে গরিব চাষিরা ব্যাপক ক্ষতির শিকার হতে হচ্ছে।

এছাড়া সমুদ্রপৃষ্ঠের এ উচ্চতা বৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। এ নিয়ে জার্মানভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা জার্মান ওয়াচ এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতি এবং জাতীয় উৎপাদনে এর প্রভাব বিবেচনায় আনা হয় ওই প্রতিবেদনে। সংস্থাটি ১৯৯০ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত এ ১৮ বছর জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে ক্ষতির শিকার দেশগুলো পর্যবেক্ষণ করে। সংস্থাটির গবেষকদের অভিমত, এ সময়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে বাংলাদেশ।

জলবায়ুর এ পরিবর্তনে নিকট অতীতে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে সিডর, আইলা সামুদ্রিক ঝড় বয়ে গেল। ২০০৭ সালে সিডর যে ক্ষতের চিহ্ন রেখে গেছে তা মুছতে অর্থাৎ উপকূলের এই বিশাল এলাকার পরিবেশ স্বাভাবিক হতে অন্তত ২০ বছর সময়ের প্রয়োজন- এমন মন্তব্য করেছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।

এছাড়াও নানা সময়ে সৃষ্টি হয়েছে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস। নীরবে প্রতিনিয়তই সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে। এতে করে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রের সমুদ্র তীরবর্তী ব্যাপক অংশ সমুদ্রের পানিতে তলিয়ে যাবে। এদেশের জনগোষ্ঠীর জীবন ধারণের আশঙ্কার সাথে সাথে অনেক ভূসম্পত্তি পানির নিচে নিমজ্জিত হবে। ফলে অনেক কৃষকই বেকার হয়ে পড়বে। এতে তাদের জীবন হুমকির মধ্যে পড়বে।

নিউইয়র্ক টাইমসের ১৯ মার্চ ২০০৯ তারিখে Ô In silt, Bangladesh sees potential Shield Against Sea Level Rise’ শিরোনামের নিবন্ধে সমিনি সেনগুপ্ত বাংলাদেশ কি করে সামুদ্রিক ঝড়ের তান্ডবের শিকার হয় তার বর্ণনা দিয়েছেন। ‘ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেইঞ্জ’-এর বরাতে তিনি বলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা মাত্র তিন ফুট বাড়লে বাংলাদেশের প্রায় ২০ ভাগ ভূমি তলিয়ে যাবে।

ব্রিটিশ সাংবাদিক জোহান হ্যারি বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে গিয়ে ব্রিটেনের `The Independent’ পত্রিকায় (প্রকাশনা ২০ জুন ২০০৮) লিখেছিলেন, ÔBangladesh is set to disappear under the waves by the end of the century.’

আইপিসিসির বরাতে তিনি উল্লেখ করেন, ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ১৭ ভাগ সমুদ্রের পানিতে তলিয়ে যাবে।

জোহান হ্যারি’র সেই আলোচিত রিপোর্টেও শেষ বাক্যটি ছিল ÔThe headstone would read, Bangladesh1971-2071 : born in blood, died in water.’

প্রকৃতির এই নেতিবাচক চরিত্র অব্যাহত থাকলে সেদিন আর বেশি দূরে নয় যেদিন বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের পুকুরে মিঠা পানির মাছ থাকবে না। নদী-খাল-বিলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়লে একে একে বিলুপ্ত হবে বিভিন্ন প্রজাতির মিঠা পানির মাছ, এমন আশঙ্কা করেছেন বিভিন্ন জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা।

বিশেজ্ঞরা বলেন, এরই মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ততা সমস্যা মোকাবিলায় নতুন খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন শাকসবজির নতুন জাত উদ্ভাবন জরুরি হয়ে পড়ছে। তারা বলেন, বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা কেবল লবণাক্ততা সহ্য করতে সক্ষম ধানের নতুন জাত আবিস্কার করতেই তাদের বছরের পর বছর গবেষণায় মগ্ন থাকতে হচ্ছে।

তারা বলেন, যেখানে কেবল একটি উন্নত জাত আবিষ্কারের সময় ও ব্যয় অনেক বেশি সেখানে নতুন জাত আবিষ্কারের কাজটি কত জটিল ও ব্যয়বহুল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। একই কথা সবুজ বেষ্টনী তৈরির জন্য উদ্ভিদের নতুন জাত আবিষ্কারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলেও মত দেন তারা।

এই দীর্ঘসূত্রতা এবং ব্যয়বহুলতার কারণে কৃষিক্ষেত্রে প্রভাব পড়ছে। দরিদ্ররা আরো দরিদ্র হচ্ছে এবং দরিদ্রের সংখ্যাও বাড়ছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর এই সংখ্যা কত দ্রুত বাড়ছে, তা পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. আতিক রহমান তার প্রবন্ধের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন অত্যন্ত সাবলীলভাবে। ‘জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য ও উন্নয়ন’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, ‘বিগত দুই-তিন বছরেও দেশে দারিদ্র্য পরিস্থিতির ক্রমাবনতি হয়েছে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ বলেন, ধনী দেশগুলোর কারণে গরিব দেশগুলোকে আজ জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হতে হচ্ছে। আর এক্ষেত্রে বাংলাদেশ অন্যতম। এটা আমাদের জন্য খুবই ভয়াবহ একটি বিষয়।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অর্থনীতিতে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত পিছিয়ে পড়ছে। বিশেষ করে গ্রামের যে অর্থনীতির চাকা তা অনেকাংশেই থমকে গেছে। ফলে তারা শহরমুখী হয়ে পড়ছে। বেকারত্বের হার প্রচুর পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এ বিষয়ে সরকারকে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সহায়তা নিতে হবে। এককভাবেও সচেতন হওয়া এবং এর প্রভাব মোকাবিলায় কাজ করে যেতে হবে বলেও পরামর্শ দেন তিনি।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এ অঞ্চলে সামুদ্রিক ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা আরো বাড়বে, বিশেষ করে বাংলাদেশে ঘনবসতি হওয়ার ফলে সামুদ্রিক ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যে দ্রুত বাড়বে, এটা সহজেই অনুমেয়, একথা বিজ্ঞানীরা বারবার বলছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের পরবর্তী এ ভয়াবহতা মোকাবিলা করতে হলে এখনি বাংলাদেশের করণীয় ঠিক করতে হবে এবং পরিকল্পনার ছক ধরে তার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এমন বললেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের অনেকে।

এ সম্পর্কে জাস্ট নিউজকে অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে আমরা অনেক পিছিয়ে গেছি । যে হারে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের গ্রাস করছে তা খুবই আশঙ্কাজনক। আমরা এখনি যদি এর মোকাবিলা করতে না পারি তাহলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের এর জন্য কঠিন মূল্য দিতে হবে।

উল্লেখ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হচ্ছে। যার ফলে দেশের অর্থনীতিতে বিশাল প্রভাব পড়ছে এবং বেকারত্বসহ নানা সমস্যার মধ্যে আবদ্ধ হচ্ছে দেশের সাধারণ জনগণ।